টিভি সমালোচনা- এত বিজ্ঞাপন! এত অস্বাভাবিক গল্প!

২১ অক্টোবর রাত ১১টায় শাহরিয়ার নাজিম জয়ের উপস্থাপনায় এটিএন বাংলায় প্রচারিত হলো সেলিব্রেটি শো ‘সেন্স অব হিউমার’। এদিন অতিথি ছিলেন এ সময়ের জনপ্রিয় ও প্রতিশ্রুতিশীল চিত্রনায়ক আরিফিন শুভ।
আমরা আগেও বলেছি, এ অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ উপস্থাপক জয়ের হিউমার সেন্স। তাঁর তির্যক প্রশ্ন ও শীতল অভিব্যক্তি ভেদ করা অনুষ্ঠানটি উপস্থিত অতিথিদের জন্য হয় দুঃসাধ্য, আর দর্শকের জন্য হয় উপভোগ্য। এদিনও ঠিক তেমনটিই হয়েছে। প্রথমেই একটি হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করা নিয়ে ব্যক্তিগত প্রশ্নে থমকে যান শুভ। তারপর একে একে শাকিব খানের সঙ্গে তাঁর তুলনা, তাঁকে নিয়ে বাজারে যে সব রটনা, ঘটনা, গুজব আছে, তা ধারাবাহিক প্রশ্নের মাধ্যমে খোলাসা করার চেষ্টা করেন উপস্থাপক। এরপর তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কেও অনেকটাই জানা যায় এ অনুষ্ঠানে। এসব কথোপকথনের পাশাপাশি বিভিন্ন সিনেমায় আরিফিন শুভ অভিনীত কিছু দৃশ্য, গান, দর্শকদের জন্য ছিল অন্যতম আকর্ষণ। তারপরও বেশ কিছু বিষয়ে দর্শকের কৌতূহল অমীমাংসিত থেকে গেছে, যেমন : তাঁর স্ত্রীর পরিচয়, স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর কোনো পরিকল্পনা আছে কি না ইত্যাদি।
আরেকটি বিষয় বেশ বেমানান হয়েছে অনুষ্ঠানের জন্য, তা হলো অভিনেত্রী বাঁধনের ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যা ও সংকট সেলিব্রেটি শোর মতো এমন একটি অনুষ্ঠানে টেনে আনা। তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের অধিকার নিয়ে আদালতে মামলা, এসব যতই মানবিক হোক না কেন, এ অনুষ্ঠানের জন্য মোটেই মানানসই হয়নি। আর এর ফলে বাঁধনের যে খুব একটা লাভ হয়েছে, তা-ও মনে হয়নি। কারণ, বিষয়টি এখন সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত।
অতএব আমরা বলব, এ অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গের অবতারণা পেশাদারির অবমাননা।
১৯ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে মো. মেহেদী হাসানের পরিচালনায় মাছরাঙা টিভিতে প্রচারিত হলো টেলিছবি একরাতের গল্প। গল্পটি শুরু হয়েছে, পথের মধ্যে একটি চায়ের দোকানে তিন বন্ধু চা খেতে বসে, সেখানে চা খেতে আসে দুটি মেয়ে। দূর থেকেই শুরু হয় তাদের মধ্যে হাসাহাসি, তেলাপোকা নিয়ে ফাজলামি। তারপর একটি বাস এলে তারা সবাই সে বাসে রওনা দেয় ঢাকার উদ্দেশে। বাসের মধ্যে শুরু হয় আরেক পর্ব হাসাহাসি, রসিকতা। এভাবে রাত হয়। বাস নষ্ট হয়। বাসের সুপারভাইজার ঘোষণা করেন, সকালের আগে বাস ঠিক হবে না। সবাই বেরিয়ে পড়ে কোথায় রাত কাটাবে, সে আশায়। তিন বন্ধু আশ্রয় নেয় এমন এক বাসায়, যেখানে সদস্য শুধু দুই বোন। এখানে আবার শুরু হয় ভূতের পর্ব। দুই বোন দুই বন্ধুকে সম্মোহিত করে, সারা রাত খেলা করে, রক্ত চুষে খায়। তারপর সকালে দেখা যায়, ওই দুই বোনসহ সবাই মিলে বাসে রওনা হয়েছে ঢাকার উদ্দেশে।
পুরো ছবিটি দেখার পর মনে প্রশ্ন জাগছিল, এটা কোনো ছবি, নাকি যা ইচ্ছে তা করার প্রামাণ্যচিত্র। কোনো গল্প নেই, ঘটনার কোনো ধারাবাহিকতা নেই। চায়ের দোকানে রসিকতা দিয়ে শুরু, তারপর বাস পর্ব, ভূত পর্ব, টেলিছবির নামে এসব হচ্ছেটা কী! মনে হচ্ছে, নির্মাতা কী নির্মাণ করছেন বুঝতে পারছেন না। অভিনেতা-অভিনেত্রী কোথায় কী অভিনয় করছেন, বুঝতে পারছেন না। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ কী প্রচার করছে, তা-ও বুঝতে পারছে না। কারও মধ্যে কোনো পেশাদারি নেই, কোনো দায়বদ্ধতা নেই। যে দর্শকের জন্য অনুষ্ঠান এবং যে দর্শক টিভি চ্যানেলগুলোর অস্তিত্ব, সেই দর্শকই এঁদের কাছে উপেক্ষিত ও গুরুত্বহীন। বড়ই দুঃখজনক।
২১ অক্টোবর আরটিভিতে রাত ৮টা ১০ মিনিটে ফরিদ উদ্দিন আহমেদের চিত্রনাট্য ও উপস্থাপনায় প্রচারিত হলো নাটক মেঘ ও ক্যামেলিয়ার গল্প। এতে অভিনয় করেছেন প্রভা, গাজী রাকায়েত, নাঈম প্রমুখ।
প্রভা একজন খ্যাতিমান চিত্রনায়িকা। সে চিত্রনাট্যকার গাজী রাকায়েতকে ডেকে একটি চিত্রনাট্য তৈরির অনুরোধ জানায় এবং তাঁকে শোনায় তাঁর জীবনের গল্প। ফ্ল্যাশব্যাকে দেখানো এই গল্পটিই হলো নাটকের গল্প। নাঈমের সাধনা, সে নায়ক হবে। সেই সাধনা যখন বাস্তবায়ন হতে যায়, তখনই সামান্য ভুল ধারণার কারণে নায়িকা প্রভা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে বের করে দেয়। ভেঙে যায় নাঈমের স্বপ্ন। এরপর ক্রোধান্ধ নাঈম প্রভাকে অপহরণ করে আটকে রাখে। জানায় তার ক্রোধের কথা। স্বপ্ন ভঙ্গের কথা। তারপর প্রভা একসময় প্রেমের অভিনয় করে, সুযোগ বুঝে নাঈমকে আঘাত করে পালিয়ে যায় ও তাকে ধরিয়ে দেয়। এরপর দেখা যায় নাঈম বদ্ধ উন্মাদ হয়ে ঘুরে বেড়ায় পথে পথে। এরপর প্রভা সত্যিকার প্রেমের টানে তাকে খুঁজে পায় এবং তাকে স্বপ্ন দেখায় ছবি বানানোর। যে ছবিতে নায়ক-নায়িকা হবে তাঁরা দুজন।
গল্পটি অনেক ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক ও অসংগতিপূর্ণ হলেও নির্মাণটি ছিল পরিচ্ছন্ন। ফ্ল্যাশব্যাকে গল্প শোনানোর কাহিনি নিয়ে নাটক-সিনেমা অনেক হয়েছে। সে দিক থেকে বিষয়টি গতানুগতিকই। এ ছাড়া প্রভাকে যেভাবে অপহরণ করা দেখানো হয়েছে, তা খুবই আনাড়ি ও অবাস্তব। আবার উন্মাদ হওয়ার পর নাঈমের আচরণ এবং বাচালতাও হয়েছে হাস্যকর। এরপর আবার প্রভার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর হঠাৎ তার আচরণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠাটাও মনে হয়েছে অস্বাভাবিক। এসব ক্ষেত্রে নির্মাতার আরও সতর্কতা প্রয়োজন ছিল।
একটি বিষয় বড়ই বেদনাদায়ক, আর তা হলো, বিভিন্ন চ্যানেল কর্তৃপক্ষের বেপরোয়া মানসিকতা। তারা যখন-তখন অনুষ্ঠান বন্ধ করে বিজ্ঞাপন তো দেয়ই, কোনো কোনো চ্যানেল অনুষ্ঠান বন্ধ করে খবর, শিরোনাম, বিশেষ ঘোষণা—সবই প্রচার করে। এমনকি মাঝে আরেকটি অনুষ্ঠানও প্রচার করে বসে। এর ফলে দর্শক যে কতটা বিরক্ত হয়, আর অনুষ্ঠান যে কতটা বিকলাঙ্গ হয়, তা বোঝার মতো বিবেক বা মন কোনোটিই যেন নেই। যে দর্শক তাঁদের অবলম্বন, সেই দর্শককে তাঁরা মনে করে অবোধ ও অপরিপক্ব। আর যে অনুষ্ঠান তাঁদের প্রাণ, সেই অনুষ্ঠান প্রচারেই তাঁরা করে অবহেলা। কবে যে এ মানসিকতা থেকে আমরা পরিত্রাণ পাব, তা ভবিতব্যই জানেন।
Share on Google Plus

About Nezam Kutubi

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment